বেকুব বেনু" (প্রথম পর্ব) মুনিরা আক্তার
পুরষ্কার নিতে যাওয়ার সময় রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে পরে বেনু, প্রায় একঘন্টা যাবত ট্যাক্সিতে বসে আছে, হঠাৎ তার চোখ পড়ল রাস্তার বা পাশে একটি চায়ের দোকানে।
চায়ের দোকানের মালিক একটা ছোট ছেলেকে বাজেভাবে বোকাঝকা করছে বলছে," বেকুবের বাচ্চা! চায়ের মধ্যে দুই চামচ দুধ দ্যাস ক্যান?
দুধকি তোর বাপে কিন্না দেয়?"বেনু অনেকক্ষণ ধরে ব্যাপারটা দেখলো।জ্যাম কমতে শুরু করলো, গাড়িও ছেড়ে দিল।চলন্ত গাড়িতে বেনুর কানে একটা কথাই বাজতে থাকে," বেকুবের বাচ্চা" বেনুর সাথে বেকুব শব্দটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কীভাবে? বলছি।
বেনু বাবা-মার অষ্টম ও সর্বশেষ কন্যা।
অভাবের সংসার ছিল তাদের।বাবা তেমন দেখতে না পারলেও বেনুর মা তাকে খুব ভালবাসতো।বেনু দেখতে ফর্সা ছিল হালকা পাতলা দেহ বেশ লম্বা। অষ্টম সন্তান হিসেবে কন্যা সন্তান কোনভাবেই কাম্য ছিল না, তাই বাবা রাগে তার নাম রাখলো "বেনজীর" বে +নজীর
সুতরাং তার দেখভাল যতটা কম করা যায় ততটাই যেন মঙ্গল। আর তার মা ভালবেসে ডাকতো বেনু।
বেনু অনেক সহজ সরল একটা মেয়ে ছিল।জগতের যাবতীয় রসিকতা, ফাজলামি, দুষ্টামি হতে অজ্ঞাত।যে যা বলতো বিশ্বাস করতো। তার এক দুঃসম্পর্কের চাচী তাকে বলতো বেকুব বেনু তুই প্রতিদিন মাথায় করে গোবর আনবি তাহলে বুদ্ধি হবে।
অগত্যা, বেনুও তাই করতো।স্কুলেও বেনুকে সবাই বেকুব বেনু বলেই জানতো।নানান রকমের কাজ তাকে দিয়ে করিয়ে নিতো।সবার কাছে বেনু ছিল হাসি তামাশার খোরাক।বেনুর সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সবাইকে বিশ্বাস করা। মাঝেমধ্যে ভাবতো স্কুল ছেড়ে দেবে, কিন্তু পারতোনা,কারন তার একটা দুর্বলতা ছিল, শক্তিও বটে সে হলো আলী।বেনু আলী এক ক্লাসেই পড়তো।বেনু আলীকে মনে মনে খুব পছন্দ করতো।এক ক্লাসে পড়লেও আলী বেনুর চেয়ে দুই বছরের বড় ছিল।তাই তাকে ডাকতো আলী ভাই।আলীই ক্লাসে একমাত্র মানুষ যে বেনুকে বুঝতে পারতো।বেনু পড়াশুনায় তেমন ভালো ছিল না,তবে তার জানার আগ্রহ ছিল অনেক,তাই শিক্ষকদের নানান রকম প্রশ্ন করতো। বেশিরভাগ সময়ে তার যৌক্তিক প্রশ্নকে অযৌক্তিক প্রমাণ করে বেকুব বলে উপহাস করতেন মাস্টার মশাইগন। একদিন মাস্টার মশাই বেনুকে খুব অপমান করে। সেদিন বেনু খুব কেঁদেছিল।আলী তাকে সান্ত্বনা দেয় আর বলে,
আ: বেনু তুই বেকুব না, স্যার নিজেই উত্তর জানেনা, নিজের মান বাঁচাতে তোকে অসম্মান করলো।তবে কি জানিস বেনু? তোর এই বেকুব নামটাকে তুই সুবিধা হিসেবেও ব্যবহার করতে পারিস।
বে: (চোখের পানি মুছতে মুছতে) কিভাবে?
আ: যারা তোর সাথে খারাপ করবে তাদের ইচ্ছা করেই কোন ক্ষতি করে দিবি আর বলবি: আমি তো বেকুব বুঝতে পারিনি।
বে:(হাসতে হাসতে) ধুর! আলী ভাই তুমি যে কি বলোনা?
আ: দেখতো? হাসলে তোকে কত সুন্দর লাগে। শুধু শুধু বেকুবের মত কান্না করিস কেন?
বে:(রেগে গিয়ে) তুমিও বেকুব বললে?
আ: হা হা হা। আমার বেকুব বেনু।
মাঝখানে বেশ কিছু দিন কেটে গেল।বেনু আলী স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে উঠেছে।চোখে হাজারো স্বপ্ন বুনে ভালোই দিন কাটছিল দুইজনের।বেনু কয়েকটা টিউশন পেয়েছিল।আর আলী একটা দোকানে সেল্সমেনের কাজ করতো।তবে তাদের সুখের জীবন আর সুখের রইলো না।বেনুর সৌন্দর্য আর সরলতা তার জীবনের কাল হলো। গ্রামের কয়েকজনের বেনুর প্রতি খারাপ নজর ছিল। আলী তা বুঝতে পারলেও বেনু বুঝতো না।আলি বেনুকে সবসময় বলতো সাবধানে চলাচল করতে।বেনুর টিউশন করিয়ে ফিরতে রাত হতো, আলী যতটা সম্ভব বেনুকে বাসা অবদি পৌঁছে দিতো সবসময়।এমনই একদিন রাতে বেনু টিউশন করিয়ে ফিরছিল।আলী সেদিন শহরে দোকানের জন্য কিছু মালামাল কিনতে গিয়েছিল। অমাবস্যা রাত, ঝোপঝাড়ের কারনে যে রাস্তা অন্ধকার ছিল তা আরো বেশি অন্ধকার লাগছিল সেই রাতে। থমথমে পরিবেশে বেনুর বেশ গা ছমছম করতে লাগলো। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বেনুর নাম ধরে ডাকলো।বেনু চমকে উঠলো।বেনু বললো কে? আমি তোমার শরীফ ভাই।বলে রাখা ভালো শরীফ ছিল আজমের(নারী পাচারকারী) ছোট ভাই।বেনুর সাথে তার প্রায়ই দেখা হতো আর তার সাথে কথা বলতে বেনু এত সাতপাঁচ ভাবতনা।
শ: এই অন্ধকার রাতে কই চললে?
বে: পড়াতে গিয়েছিলাম এখন বাড়ি যাচ্ছি
শ: আমি এগিয়ে দি চলো।
বে: না থাক আমি পারবো।
শ: ভয় পেয়ে গেলে নাকি? আমি তো তোমার ভাইয়ের মতো। চলতো?
বেনু আর কিছু বললোনা।হাটতে হাটতে শরীফ বেনুকে নানা রকমের প্রশ্ন করতে থাকে। আলীর সাথে সে কেনো এত মেলামেশা করে, প্রেম করে কিনা আরো অনেক কিছু।হাটতে হাটতে একটা ঝোপের সামনে চলে এলে শরীফ খানিকটা ধীরে হাঁটা শুরু করে। বেণুকে বলে, বেনু চলো আজকে আমার বাসা থেকে ঘুরে আসবে।বেনু রাজি না হলে, শরীফ তাকে জোর করা শুরু করলো।(চলবে)

Comments
Post a Comment